একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন তুফায়েল আহমদ। ছেলের গ্রেপ্তার ও রিমান্ড চাওয়ার খবর পাওয়ার পর বিদেশে থাকা তাঁর বাবা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন—এমন দাবি উঠেছে মৌলভীবাজারে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধনে। বাবার মৃত্যুর পরও কারাগারে থাকায় তাঁর জানাজায় অংশ নিতে পারেননি তুফায়েল। অন্যদিকে, গত ২৭ আগস্ট কুলাউড়ায় সংঘটিত ঘটনার এজাহার ও ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজের মধ্যে কথিত অসঙ্গতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মানববন্ধনকারীরা।
তুফায়েলের মুক্তি, কুলাউড়ার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সিসিটিভি ফুটেজসহ সব ডিজিটাল প্রমাণ যাচাইয়ের দাবিতে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বাদ আসর মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব চত্বরে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ, মৌলভীবাজার’-এর ব্যানারে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক বিরোধ ও প্রতিহিংসার কারণে তুফায়েল আহমদকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাঁদের দাবি, কুলাউড়ার ঘটনার প্রকৃত চিত্র সিসিটিভি ফুটেজে ভিন্নভাবে উঠে এসেছে। তাই শুধু এজাহারের ওপর নির্ভর না করে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যসহ সব ধরনের প্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানান তাঁরা।
বক্তারা জানান, তুফায়েলের পিতা বিদেশে অবস্থান করছিলেন এবং দেশে ফেরার জন্য তাঁর বিমানের টিকিটও কাটা হয়েছিল। এর মধ্যে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং রিমান্ড চাওয়ার খবর জানতে পারেন তিনি। এরপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং পরবর্তীতে মারা যান বলে বক্তারা দাবি করেন।
সাফওয়ান হাবিব বলেন, তাঁর বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে তুফায়েল জানাজায় অংশ নেবে। কিন্তু তুফায়েল কারাগারে থাকায় সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিদেশের মাটিতেই তাঁকে দাফন করা হয়।
বক্তারা বলেন, তুফায়েলের পিতার মৃত্যুর জন্য কাউকে আগাম দায়ী করা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়। তবে মামলার খবর, তুফায়েলের গ্রেপ্তার এবং তাঁর বাবার মৃত্যুর মধ্যকার ঘটনাপ্রবাহে কোনো আইনগত সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
মানববন্ধনে পাঠ করা লিখিত বক্তব্যে ২৭ আগস্ট রাতে কুলাউড়া থানাধীন ‘ডাইনিং ডিলাইট’ রেস্টুরেন্টের সামনে সংঘটিত ঘটনার এজাহার ও সিসিটিভি ফুটেজের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বক্তাদের দাবি, মামলার বাদী তামিম আহমদ এজাহারে উল্লেখ করেছেন, তাঁরা বড়লেখা যাওয়ার পথে বাধার মুখে পড়েন এবং তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়। তবে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার পূর্বাপর সম্পর্কে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায় বলে মানববন্ধনকারীরা দাবি করেন।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট রাত ৮টা ২৯ মিনিট ৮ সেকেন্ড থেকে ৮টা ২৯ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড পর্যন্ত ফুটেজে বাদী ও তাঁর সহযোগীদের আগে থেকেই ঘটনাস্থলে অবস্থান করতে দেখা যায়। পরে তামিম আহমদ মোটরসাইকেলে এসে নেমে হাতে থাকা একটি স্টিক উঁচিয়ে সামনে এগিয়ে যান এবং তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য ব্যক্তিরাও এগিয়ে যান বলে তাঁরা দাবি করেন।
মানববন্ধনকারীরা বলেন, সিসিটিভি ফুটেজের পূর্ণাঙ্গ কপি, ঘটনার আগের ও পরের ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণ একসঙ্গে পরীক্ষা করা হলে ঘটনার প্রকৃত সূচনা এবং কারা প্রথম আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছিল, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তাঁরা দাবি করেন, ‘ডাইনিং ডিলাইট’, ‘রোজ ক্যাফে’সহ ঘটনাস্থল ও আশপাশের স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত শনাক্ত করে আইনানুগভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। ফুটেজের অখণ্ডতা ও প্রামাণিকতা নিশ্চিত করে তা তদন্তে ব্যবহার করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, মোবাইল ফোনের তথ্য, ঘটনাস্থলের অন্যান্য ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করার দাবি জানান বক্তারা।
তাঁদের আরও দাবি, তদন্তে যদি এজাহারে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
মানববন্ধন থেকে তুফায়েল আহমেদের অবিলম্বে মুক্তি, ২৭ আগস্ট কুলাউড়ার ঘটনার নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত, সংশ্লিষ্ট সব সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ ও যাচাই, প্রকৃত ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং এজাহারে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া তুফায়েলের পিতার মৃত্যুর ঘটনাপ্রবাহ এবং তাঁর কারাবন্দিত্বের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো আইনগত সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবিও জানানো হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, “আইন সবার জন্য সমান। অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হতে হবে।” তাঁরা দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে আনার দাবি জানান। দাবি বাস্তবায়ন না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা।
শফি আহমদের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বুরহান উদ্দীন। বক্তব্য দেন বদরুল আলম, আব্দুল আলীম, আমিনুল ইসলাম সেলু ও সাফওয়ান হাবিব।
মানববন্ধনে তুফায়েল আহমেদের বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে তুফায়েলের পিতার আত্মার মাগফিরাত এবং কুলাউড়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন হাফিজ মাওলানা মুফতি বদরুল আলম।