দেওয়ান মোনাকিব চৌধুরী :
মৌলভীবাজার শহর ও শহরতলির প্রধান সড়কগুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে চলছে তীব্র নৈরাজ্য। কোনো প্রকার বৈধ কাগজপত্র ও রুট পারমিট ছাড়াই বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দুই সহস্রাধিক সিএনজি চালিত অবৈধ টমটম। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, একাধিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাত ধরে এসব অবৈধ যান চলায় যেমন শহরে তিব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনই বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুন মৌলভীবাজার বিআরটিএ কার্যালয় থেকে পর্যায়ক্রমে মোট ১৩৫টি সিএনজি চালিত টমটমের রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এরপর আর কোনো রুট পারমিট দেওয়া হয়নি। বাণিজ্যিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশন মেয়াদ শেষে বিআরটিএ দপ্তরে গিয়ে নবায়ন করার আইনি বিধান থাকলেও বিগত দীর্ঘ ১৩ বছরে তা করা হয়নি। ফলে বর্তমানে সচল থাকা প্রায় দুই হাজারেরও বেশি গাড়ি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে প্রধান সড়কগুলো দখল করে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করছে।
তথ্য মতে বর্তমানে দুই হাজারের বেশি গাড়ি রাস্তায় চললেও হালনাগাদ ট্যাক্স টোকেন আছে মাত্র ৫১টি গাড়ির এবং হালনাগাদ ফিটনেস সনদ রয়েছে মাত্র ৫৩টি গাড়ির। অর্থাৎ, সিংহভাগ গাড়িই চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই অবৈধ টমটমোওগুলো থেকে গাড়ি প্রতি গড়ে প্রায় ২ লক্ষ টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকার সরকারি ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। অথচ অদৃশ্য কারণে মৌলভীবাজারের প্রশাসন ও বিআরটিএ দপ্তর সম্পূর্ণ নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, রুট পারমিট না থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক যানবাহনের বিরুদ্ধে তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই ব্যাপারে কতৃপক্ষের ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করে কোনো কার্যকর অভিযান পরিচালনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, এই ২ সহস্রাধিক ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ টমটম চালকদের অধিকাংশেরই কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। এই বিশাল সংখ্যক গাড়িকে কেন্দ্র করে জেলা শহরের অতি গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অবৈধভাবে স্ট্যান্ড বসিয়ে প্রকাশ্যে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলছে একটি মহল। এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর উভয় পাশের প্রায় অর্ধেক অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় ব্যস্ততম সড়কগুলো অত্যন্ত সংকীর্ণ গলিপথে পরিণত হয়েছে। এর ফলে জেলা শহরে সার্বক্ষণিক তীব্র যানজট ও জনভোগান্তি তৈরি হচ্ছে। অনভিজ্ঞ চালকদের বেপরোয়া গতি ও অদক্ষতার কারণে প্রায়শই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, যাতে অনেকের প্রাণহানিও ঘটেছে। স্থানীয় ভোক্তা ও সাধারণ নাগরিকদের দাবি, মৌলভীবাজার জেলায় দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের প্রচ্ছন্ন সায় বা রহস্যময় নীরবতা ছাড়া এত বড় দুর্নীতি ও নৈরাজ্য কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
মৌলভীবাজারের বিআরটিএ সহকারী পরিচালক ইতিপূর্বে সংবাদ মাধ্যমকে জানান যে, চলমান ১৩ বছরে প্রতিটি সিএনজি চালিত টমটম গাড়ি থেকে প্রায় ২ লক্ষ টাকা করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে বিশাল অংকের ক্ষতি। অন্যদিকে ট্রাফিক বিভাগ জানায়, বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ চেক পোস্ট বসিয়ে অভিযান পরিচালনা করলে ট্রাফিক পুলিশ সর্বোচ্চ সহায়তা করতে প্রস্তুত। মৌলভীবাজার পৌরসভার প্রশাসক জানান, পৌর প্রশাসক হিসেবে এখানে তার বিশেষ কিছু করার একক ক্ষমতা নেই। পৌরসভার কোনো নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেটও নেই। পুরো বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক সিদ্ধান্ত নিলেই কেবল বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব।
মৌলভীবাজারের সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব উদ্ধার এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।