দেওয়ান মোনাকিব চৌধুরী মৌলভীবাজার (সদর) প্রতিনিধি :
কাউয়াদিঘি হাওরের দক্ষিণ প্রান্তে মৌলভীবাজার-কুলাউড়া হাইওয়ের ইসলামপুর ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে মৌলভীবাজার জেলায় স্বাগত জানিয়েছেন হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। সকাল ১১ টা থেকে হাওর রক্ষা আন্দোলনের দাবি সম্বলিত রঙিন ব্যানার ফেস্টুন শ্লোগানে রাজপথ মুখরিত রাখেন। আ স ম ছালেহ সোহেল এর সভাপতিত্বে এবং এম খছরু চৌধুরীর সঞ্চালয়নায় আয়োজিত বরণ অনুষ্ঠানের পথ সভায় বক্তব্য রাখেন অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ, শিক্ষক ধীরাজ ভট্টাচার্য, হুমায়ুন রশীদ, মোঃ আলমগীর হোসেন, দেওয়ান মুনাকিব চৌধুরী, যুবদল নেতা মোঃ গৌছুজ্জামান, তাবাসসুম চৌধুরী বিথি, সামছুদ্দিন মাস্টার, রনজিৎ দেবনাথ, ছাত্রনেতা আবু তালেব চৌধুরী প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, মৌলভীবাজার জেলার উন্নয়নে শিল্পায় ও সৌরবিদ্যুত উৎপাদন দরকার। কিন্তু এটাকে উছিলা করে দেশের ভূমিখেকো শিল্প মালিকেরা হাওরের মাঝখান ভরাট করে পরিবেশ ধ্বংস করার যড়যন্ত্র করছেন। হাওরের সস্তা মূল্যের জমি ক্রয় করছেন। ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করার মতো আইন লঙ্ঘনের অপরাধ করছেন। প্রশাসন তাদের দ্বারা অনৈতিকভাবে প্রভাবিত। বিকল্প জায়গা থাকতে হাওর ধ্বংসের যড়যন্ত্র কৃষক মৎস্যজীবীরা মেনে নেবে না। বক্তারা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, অধিক জনসংখ্যার ছোট দেশের যে কোনো উন্নয়নের আগে কৃষি-মৎস্য-হাওর-নদী-পরিবেশের কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে মৌলভীবাজার জেলায় সৌরবিদ্যুত উৎপাদনে হাওর রক্ষা আন্দোলনের ১২ দফা দাবি বিবেচনায় নিতে হবে। বিবেচনায় নিতে হবে জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরীর গবেষণা, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা। ভূমিখেকো লুটেরাদের কবল থেকে হাওর-নদী-পরিবেশ রক্ষা করা এখন বাংলাদেশের দায় হয়ে দাড়িয়েছে। এই দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে না-আসলে বিগত সরকারের লুটের নীতি বহাল থাকবে। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও অর্থনীতিতে হাওরাঞ্চলের অবদান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ষায় হাওরের দৃষ্টিনন্দন বিশাল জলরাশি দেশের প্রাকৃতিক মৎস্যের সবচেয়ে বড় উৎসস্থল। শুকনো মৌসুমে এসব হাওর হয়ে ওঠে বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার। দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর নিয়ন্ত্রণ তথা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধে নিরন্তর ভূমিকা রাখছে হাওরাঞ্চল। হাওর-নদী-চা বাগান-ঝরনা-পাহাড়ি টিলা-খাল-বিলের অপূর্ব সমন্বয়ে সৃষ্ট আমাদের মৌলভীবাজার। জেলার ভূপ্রকৃতির ফুসফুসের ভূমিকা পালন করছে: উজানের চা-বাগান বেষ্টিত পাহাড়-জঙ্গল। আর কিডনির ভূমিকা পালন করছে: ভাটির দিকের ছোট-বড় ৩০টি হাওর। হাওর ধ্বংস করা মসনে জেলার প্রকৃতির কিডনী ধ্বংস করা একই। পরিবেশকে হত্যা করা। দেশের সেরা বিশেষজ্ঞরা মৌলভীবাজারে এসে বলে গেছেন, মৌলভীবাজার জেলার হাওর ধ্বংস না করেও নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি সংগ্রহ করা সম্ভব। সরকার ও সরকারি দপ্তরসমূহের দুর্বলতা ও দায়-দায়িত্বহীনতার সুযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি কোনোরূপ ফিজিবিলিটি সমীক্ষা ছাড়া প্রকৃতির কিডনির ভূমিকা পালনকারী মৌলভীবাজারের হাওরগুলোর সস্তামূল্যের কৃষিজমি/জলাভূমি টার্গেট করেছে। ইতিমধ্যে পূবের হাওর শেষ হয়ে গেছে। হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতৃত্বে কৃষক-মৎস্যজীবী ও পরিবেশ সচেতন জনতার সংগ্রামের প্রেক্ষিতে সরকার হাকালুকি হাওরের সুরক্ষা আদেশ জারি করলেও এখনো অরক্ষিত রেখে দিয়েছেন কাউয়াদিঘি, হাইল হাওরসহ অন্যান্য হাওর। আমাদের সংগ্রহকৃত তথ্যমতে প্রাণ আরএফএল, ইসলাম এগ্রোভেট, জজ অ্যাসোসিয়েটস, আনলিমা পাওয়ার লিঃ এবং আজম জে চৌধুরীর কোম্পানিসহ বিভিন্ন কোম্পানি এসব হাওর থেকে আড়াই হাজার একরের বেশি কৃষিজমি কিনে নিয়েছেন। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে হাওরের মাঝখান ভরাট করে যেকোনো ধরনের শিল্পায়ন হাওর পাড়ের কৃষক-মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা ও বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করবে এবং পরিবেশ বিপর্যয় অনিবার্য করে তুলবে। আমরা মনে করি, মনু সেচ প্রকল্প বাঁধের হাওর-দিকের ৬৪ কি. মি. দৈর্ঘ্য পরিমাণ উন্মুক্ত ভূমি, মনু সেচ প্রকল্পের প্রধান দুটি ক্যানেল ও সাব-ক্যানেলের মধ্যকার ১০৫ কি. মি. দৈর্ঘ্যের ভূমি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে সরকার ব্যবহার করতে পারেন। এতে কোম্পানি মালিকদের কাছে ভূমি লীজের বিনিময়ে সরকারের আয় বাড়বে, পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র সহ প্রকৃত কৃষি জমিও রক্ষা পাবে।